বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্ত খাতে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান: দুর্নীতি কমানোর সম্ভাবনা কতটা?
- Repoter 11
- 01 Jan, 2026
-মাহ্ফুজ নবীন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দুর্নীতি একটি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে, দেশটি দুর্নীতি উপলব্ধি সূচকে নিম্ন স্থানে রয়েছে, যা বিনিয়োগ এবং সামাজিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন উঠেছে: দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোতে বাইরের দেশের অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধান, আইন প্রণয়ন এবং চুক্তিভিত্তিক সার্ভিসের ব্যবস্থা করলে দুর্নীতি কমতে পারে কি? এই বিশ্লেষণে আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলো চিহ্নিত করব, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের উদাহরণ পর্যালোচনা করব এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করব।
দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান খাতসমূহ: কোথায় সমস্যা সবচেয়ে তীব্র?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর ২০২৩-২০২৪ এর জাতীয় গৃহস্থালী জরিপ অনুসারে, কয়েকটি খাতে দুর্নীতির হার অত্যধিক। পাসপোর্ট সার্ভিস (৮৬%) সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত, যেখানে ঘুষ, অনিয়মিত পেমেন্ট এবং প্রক্রিয়া বিলম্ব সাধারণ।
এরপর রয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) (৮৫.২%), যেখানে লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি প্রবল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (পুলিশ) এবং বিচার বিভাগীয় সার্ভিসও শীর্ষে, যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। অন্যান্য খাতের মধ্যে স্বাস্থ্য খাত, ব্যাংকিং, শক্তি খাত, সরকারি প্রকল্প এবং আইটি খাত উল্লেখযোগ্য, যেখানে অনিয়মিত পেমেন্ট এবং কেলেঙ্কারি সাধারণ। এই খাতগুলোতে দুর্নীতি অর্থনৈতিক ক্ষতি করে, যেমন বিনিয়োগ হ্রাস এবং জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানের প্রস্তাব: চুক্তিভিত্তিক সার্ভিসের সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত মডেলে, এই খাতগুলোতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএনডিপি বা ওইসিডি-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধান চালু করা যেতে পারে। এতে আইন প্রণয়ন, অডিটিং এবং প্রশিক্ষণের জন্য চুক্তিভিত্তিক সার্ভিস প্রদান করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অ্যান্টিকরাপশন ফর ডেভেলপমেন্ট গ্লোবাল পার্টনারশিপ ২৫০টি পার্টনারের সাথে দুর্নীতি মোকাবিলায় কাজ করছে, যা উন্নয়নশীল দেশে সফলতা দেখিয়েছে। ইউএন কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট করাপশন (ইউএনসিএসি) এবং ওইসিডি অ্যান্টি-ব্রাইবারি কনভেনশনের মতো ফ্রেমওয়ার্কগুলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রচার করে।
কয়েকটি দেশে এই মডেল সফল: যেমন ২০১২ থেকে ২৫টি দেশে দুর্নীতি হ্রাস পেয়েছে আন্তর্জাতিক সাপোর্টের কারণে।
সুবিধা: স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক লাভ
আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে দুর্নীতি কমতে পারে, কারণ এতে নিরপেক্ষ অডিট এবং প্রশিক্ষণ চালু হবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাপোর্ট দুর্নীতি কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা বাড়িয়েছে অনেক দেশে।
বাংলাদেশে অ্যান্টি-করাপশন কমিশন (এসিসি) এর পারফরম্যান্স মিশ্রিত, কিন্তু আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এটিকে শক্তিশালী করতে পারে।
আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান এবং চুক্তিভিত্তিক সার্ভিস দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে পাসপোর্ট, বিআরটিএ এবং পুলিশের মতো খাতে, যদি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকে।0a4c9c তবে, এটি একমাত্র সমাধান নয়; স্থানীয় সংস্কার এবং জনসচেতনতা অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই মডেল পরীক্ষা করা যেতে পারে, যা বাংলাদেশকে একটি স্বচ্ছ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে।
অসুবিধা: চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকি
তবে, এই মডেলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশে এসিসি-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবে দুর্বল, এবং আন্তর্জাতিক সাপোর্ট কখনো হতাশাজনক ফলাফল দিয়েছে। সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ বাইরের হস্তক্ষেপকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। খরচও একটি ফ্যাক্টর, এবং স্থানীয় প্রতিরোধ ছাড়া এটি ব্যর্থ হতে পারে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সফলতার জন্য ফ্রি প্রেস এবং সিভিল সোসাইটির ভূমিকা অপরিহার্য।
ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপের প্রয়োজন
আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান এবং চুক্তিভিত্তিক সার্ভিস দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে পাসপোর্ট, বিআরটিএ এবং পুলিশের মতো খাতে, যদি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকে। তবে, এটি একমাত্র সমাধান নয়; স্থানীয় সংস্কার এবং জনসচেতনতা অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই মডেল পরীক্ষা করা যেতে পারে, যা বাংলাদেশকে একটি স্বচ্ছ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *










